Monday, October 25, 2010

ধ্বংসের পাটাতনে (8)

জঙ্গলের আবছায়ায় পেট খালি করে সে। আঃ! শান্তি! তখনই বেজে উঠে সুরটা- একটানা একঘেঁয়েভাবে ইনিয়ে বিনিয়ে কেঁদে মরে, “বৈদেশ গেলে আমি তোমার সংগ ছাড়ুম না রে- সংগ ছাড়ুম না।” হায়রে নিরঞ্জন- কেউ তার সংগ ছাড়ল না; না চন্দ্ররাত, না পুকুরপাড়, না বাঁশি- সঙ্গ ছাড়ল বনমালীর রাধিকা- যার জন্য এত সুর, এত কান্না, ইনিয়ে-বিনিয়ে বাঁশির রোদন; সাহা বাড়ির মাধবী। আহারে! কত রাত ধরে মেয়েটা কেবল শুনেই গেল, শুনেই গেল- রাধিকা হয়েছিল একদিন; গভীর রাতে ছুটে বেরিয়েছিল প্রায়। শেষরক্ষা হয়নি আর- মায়ের হাতে ধরা। সব্বোলাশ! উঠতি মেয়ে- বাঁশিতে পায়িছে। আল ঘলে লাখা যাবি লা।  -তারও সপ্তাহ্ দুয়েক পরে পালকিতে চেপে মেয়েটা অন্যজনার। নিরঞ্জনের বিরাম নেই। -এ এক নেশা; এক মোহ- বাঁশির মোহ- রাতের মোহ- চাঁদের মোহ- খালিগায়ে কাঁপন ধরানো শিরশিরে বাতাসের মোহ। পুকুরের জল টলটল, ধারটাতে হাস্নাহেনার ঝাড়- এক উগ্র ধরণের মিষ্টি গন্ধে পরিবেশটা আরেকটু ভারী, আরেকটু স্বপ্নীল- এর কোনটাকে অস্বীকার করবে সে! হয়তো এর পুরোটাই স্বপ্ন- উগ্র ধরণের মিষ্টি স্বপ্ন; চোখে জ্বালা ধরানো চাঁদ, বুকে ব্যাথা জাগানো বাঁশি, গায়ে কাঁপন ধরানো ঝিরঝিরে হাওয়া, মস্তিষ্ক ভারী করে তোলা উগ্র ধরণের হাস্নাহেনা- চাঁদটা আরেকটু পষ্ট হলে বাঁশিটা আরেকটু করুণ, আরেকটু গভীর- সুরটা তাকে চেপে ধরে; বুকের গভীরতম সূক্ষ প্রদেশে নিজের অজান্তে লালন করে চলা একটি স্থির চিত্র ছিন্ন-ভিন্ন-বিদীর্ণ করে তোলে- একান্ত ব্যক্তিগত একটি। না! কিছুই হওয়া গেল না জীবনে- না কেষ্ট, না মধাব; অন্ততঃ গোষ্ঠের রাখাল হলেও- হায়রে কেষ্ট; বুকের ভেতর কি ব্যাথাটাই না ছিল তার- অনেক বেশি- বাঁশির সুরে ঝরে ঝরে পড়ত-  ছুটে বেড়াত দিগবিদিগ- কিছুটা ভালবাসা সেখানে; রাধা কিভাবে সইবে এত! আর এখানে, কোন দূর পাড়াগাঁয়ে এক মধ্যবয়সী দোকানদারের ঘামে ভেজা লোমশ বুকের নিচে একজোড়া শক্ত বাহুর পিঞ্জরে বন্দী তার রাধা। লোকটা সব খেয়ে নিল তার- বুক-গলা-পেট-হাত-পাও- সব। লোকটা ঠোঁট খেল তার, বাতাবি লেবুর কোঁয়ার মত বাঁকা-বাঁকা ঢেউ খেলানো ঠোঁট দুটো; এমনকি কানদুটো- খাবেই তো। কান থাকলে মেয়েটা বাঁশি শুনবে, ঠোঁট থাকলে বলতে চাইবে, পা থাকলে ছুটে আসবে- এত করতে দেওয়া হবে কেন ওকে! জানে না সে; কিছুই না। নেশায় পেয়েছে ওকে; তীব্র নেশা। নেশায় পেয়েছে রসুলকেও- ধীরে ধীরে সে এগিয়ে চলে; জঙ্গল থেকে বেরিয়ে বিশাল ধানক্ষেতের মাঝখান দিয়ে সাপের মত একেবেঁকে চলা আল ধরে- নিরঞ্জন তখনো আধামাইল দূরে; তবে, সুরটা- ওর বাঁশিটা; অনেক কাছে- বুকের ঠিক অন্তঃস্থলে- সে ক্রমাগতই এগিয়ে চলে। আরো কিছুটা; আকষ্মাৎ অন্যরূপ- তার ঠিক পিছন পিছন কে বা কারা! ভেজা ঘাসের উপর সমবেত পদশব্দ- থপথপ, খসখস; আরেকটা মৃদু গুঞ্জন- প্রচন্ড ভয়ে তার শিরদাঁড়া কেঁপে কেঁপে উঠে। পিছনে তাকিয়ে দেখার সাহস হয় না আর- ঝেড়ে দৌড় দিবে না কি? সহসাই তার জটিল ভাবনা-চিন্তার বেড়াজাল থেকে মুক্তি পায় সে- কিছু বুঝে উঠার আগেই, ধপ্- কেউ একজন সজোরে মাথায় মেরে বসে তার। সে হুমড়ি খেয়ে পড়ে এবং উঠে দাঁড়ানোর আগেই শক্ত কতগুলো হাত মাটিতে চেপে ধরে- চিৎ করে; এবার সে দেখতে পায় তাদের- চাঁদের রঙের পোষাক সবার; একই ধারার দাঁড়ি- এ যে হাজারখানা গফুর; হাতে তাদের লম্বা তলোয়ার- চাঁদের আলোয় চকচকিয়ে উঠে। এখানে রসুল কোরবানির গরুর মতন- চেয়ে চেয়ে দেখে; আকষ্মাৎ আর্তচিৎকার- প্রচন্ড রকমের; বাঁশির আওয়াজ ছাপিয়ে, আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে- তারা যেমন এসেছিল তেমনি চলে যায়।

অনেকটা ধ্বংসের পাটাতনে যখন অমানিশা; দৃশ্যটি চিতল মাছের মত ভুস্ করে রসুলের স্মৃতির পর্দায় ঘাঁই দিয়ে উঠে। একগাদা কিলবিলে শরীর, হাঁড়ে-হাঁড়ে ঠকঠক, পায়ে পায়ে থপথপ-। উপরে গোল একটা চাঁদ, নিচে মাতাল বাঁশির সুর- সবুজ ঘাসের বুকে একরাশ লাল রক্তের উষ্ণতায় তড়পাতে তড়পাতে তাদের কোনটাই উপভোগ করা হয়ে উঠেনা তার।

Friday, October 08, 2010

ধ্বংসের পাটাতনে (৩)

কাঁধে-মাথায়-হাতে আস্ত দু-চারটি সংসার বয়ে তারা এগিয়ে চলে। তাদের সীমান্তে দু-চারটি কীর্ত্তনখোলা - বয়ে নিয়ে যায় কাকে কোথায়; অদ্ভুত জীবনধারা। সুলেখার দু-কাঁখে দু-দুটি জলজ্যান্ত হাঁড়-চামড়ার দলা; ক্ষিধেয়-দুর্বলতায়-এক দিনের অভুক্ততায় তাদের গলা বেয়ে অবিরাম চিঁ-চিঁ - সদ্য ডিমফোটা ছানা যেন। -না! এখনতরি মরে লি। সুলেখার কাঁধ শরীর ছেড়ে নেমে আসতে চায়। গায়ের সবকটি হাড়ের নির্লজ্জ প্রদর্শনী- ক্রিমি ভর্তি গোল পেটের যমজ দুটো আস্ত হিমালয় যেন- বিরক্তিতে, যন্ত্রণায়, দু-দিনের অভুক্ততায় মাথায় আগুন
-লাক্কসীর নোল বেলেছে। একগন্ডা গিলে খালো- এখনতরি পিয়াস মেটোয় লা। খাবি তো খা-।খা-! খা-! আর কত লিবি? লে-
হয়তো গাঙের জলে ডুবে যাওয়া ছেলেগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। সব গাঙই এক; গাঙের মানুষগুলো- সবার খাই খাই; এত খায় তাও ক্ষিধে মেটে না। -কোথায় যাচ্ছে তারা! -কতদূর? -কেউ জানে না।

সন্ধের আগে সবাই ঘর ছাড়ে; ব্যতিক্রম রসুল। জমির যাওয়ার আগে শুধোয়
-যাবি নে রাছুল? গব তো চইলে গেল।
না। সে যাবে না। গফুরের ক্রোধের আগুন কতটা তেজী সে দেখে ছাড়বে। সবাই ওকে ছেড়ে চলে যাক; সে একাই একশ- এ বিরানভূমির দৌর্দন্ড প্রতাপশালী বীরবিক্রম।

রাত নামে। আকাশে গোল একটা চাঁদ তার আলোর পাখা মেলে- ধীরে, অতি ধীরে। একটু একটু উত্তরালি হাওয়া- শিরশিরে কাঁপুনি; শীতটা একটু আগেভাগেই অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। রসুল একটা ঘোরের মধ্যে- কোন এক গোলকধাঁধা; সব কিছু ধোঁয়া-ধোঁয়া ধোঁয়াময়, পুরু কুয়াশার চাদর এক। তার অনুভূতির স্নায়ুগুলোতে প্যাঁচ লেগে যায়। কিছুই ভাবতে পারে না সে; কিছুই না। এভাবে অনেক্ষণ- তারপর; তার চোখের সামনে সব পষ্ট হয়ে আসে। তাদের সীমান্ত পেরিয়ে দূরবর্তী দু-চারটা গন্ডগ্রামের তীরবর্তী নষ্ট পাহাড়ে কারা এসে থামে; নামহীন- গোত্রহীন- অনেকটা পঁচন লাগা সত্তা- এবড়ো-থেবড়ো নাকমুখ, মুখে শত শত দাগ ( দাগ নয়- ফুঁটো। জঘণ্য, বিভৎস, উৎকট- পঁচা মাংসের জলজ্যান্ততা। নয়তো লালবুক ব্যাঙের বিষথলি- নরকের আবর্জনা )। তাদের কন্ঠস্বরে জান্তবতা, পদছন্দে তীব্র হাহাকার- এ যে একরাশ পঁচা মাংসের তাল- সদ্য মৃত্যুকূপ থেকে উঠে আসা। পিঁপড়ের মত তারা এগিয়ে চলে। পায়ে পায়ে থপথপ, হাঁড়ে হাঁড়ে ঠকঠক- চলার তালে পঁচা-গলা মাংস খসে খসে পড়ে; সাদা সাদা গোল গোল চোখগুলো বেরিয়ে আসে কারো। বিভৎস সব নষ্টপ্রেত- । না!!! -প্রচন্ড চিৎকারে আত্মারাম খাঁচাছাড়া বুঝি- রসুল ধরমড়িয়ে উঠে বসে। শরীরের প্রতিটি রন্ধ্র বেয়ে দরদরিয়ে ঘাম- স্বপ্ন দেখছিল বুঝি- প্রচন্ড ভয়ে বুক-গলা শুকিয়ে কাঠ; হাতড়ে হাতড়ে বালিশের নিচ থেকে প্রজাপতি মার্কা ম্যাচবাক্সটি বের করে। যত্তসব! খালি ঘস্ ঘস্; আগুনের চিহ্নমাত্র নেই- হাতের ঘামে ভিজে গিয়েছে হয়তো। আরো একটি কাঠি ঘসে নিরাশ হয় সে। হওয়ার নয়। না! আর রাস্তা নেই। তলপেটের চাপটাও হঠাৎ বেড়ে অনেকগুণ। ঘোরের মধ্যে কখন সে বিছানায় এসে শুয়ে পড়েছিল- এবার তার স্নায়ুগুলো সজীব; হাতের আন্দাজে দরজা খুঁজে নিয়ে বেরিয়ে আসে সে। সব মনে পড়ে যায় তার। সামনের বামের ঘরটা আইজুদ্দির আর ডানেরটা জমিরের। মাঝখানের চিকন পথটা পেরোলে কিছুটা জঙ্গল; তারপর মাঠ- আদিগন্ত ধানের ক্ষেত; মাঝখানে দু-চারটা পুকুর- বেশ দূরে দূরে। সেখানে চাঁদ চাঁদ আর খালি চাঁদ; চাঁদের মাতাল করা আলো। -এই বস্তির বাঁশ-খড় পেরিয়ে চাঁদটা ভিতরে পৌঁছায় না কখনো ।

ধ্বংসের পাটাতনে (২)

ভাবনায় ছেদ পড়ে। একটা শোরগোল ধেয়ে আসে সেখানে- নারীকন্ঠের হাঁউমাউ, বুড়ো মানুষের খনখনে গলা, বাচ্চাকাচ্চার অসহ্য চেঁচামেচি; এর মধ্যে ভাঙা গলায় কি সব বলতে বলতে এগিয়ে আসে হরিপদ। কপালের কিনার বেয়ে রক্তের ধারা- কেউ মাথায় মেরেছে তার। -কে? রসুল ছুটে যায়। অমনি সবাই যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ে। সবাই বলে- বর্ণনার জট লেগে যায়। তার মধ্য থেকে যা বোঝা যায় তা হল; কিছুক্ষণ আগে বাধের উপরে গফুর মোল্লা হরিপদকে ডেকে বলে
-সবাইকে লিয়ে বিকোলের আগে বোরেয়ে যাবি। হামার জমিন হামাকে খালি কোরে দিবি।
-তুমার জমিন! আমরা যাচ্ছি নে কোথাও। যা খুশি কোরে লাও।
অমনি বলা নেই, কওয়া নেই- হাতের লাঠিটা সজোরে হরিপদের মাথায়
বসিয়ে দিল গফুর। বাধশুদ্ধ মানুষ চেয়ে চেয়ে দেখল; কেউ বললনা কিছুই। এ এলাকায় গফুরকে ভয় পায় সবাই; গোপনে অনেক কিছুই শোনা যায়- কি সব র্পাটি-র্ফাটি করে; কারো সাথে বনিবনা না হলে হাত-পাও এর রগ কেটে দেয়। এইতো গেল বছর বাধের উপর যে জোড়া-খুনটা হল- ভয়ে কেউ ঘাটায় না ওকে।

এই হট্টগোলে অতকিছু ভাবার ফুসরত নেই রসুলের। -মগের মুল্লুক পেয়েছে! ও বলল আর অমনি চোদ্দ ঘর মানুষ সবকিছু ছেড়ে-ছুড়ে গাঙে ভাসান! আর সহ্য করা যায় না- চল সবে! বেশিদূর যেতে হয় না গফুর সেদিকেই আসছিল
-কি রে রাছুল! তোরা নাকি ঘর ছাড়বিনে?
-ছাড়ব ক্যানে! উ কি তুমার জমিন?
-ছ্যেল না। তবে এখন হামার- সরকারি জমিন; হামি লিজ নিলেম।
-ঝুট্! উ তো নেরঞ্জনের জমিন- সবে জানে।
-তু কি পাগল হলি! পাগল-ছাগল লোক, বনে-বাদারে ঘুইরে মরে, বাপ-মা ছ্যেল কি ছ্যেল না- উর জমিন কিসের!
-অত বুঝিনে বাপু! আমরা যাচ্ছিনে কোথাও।
-ভাল হবি নে রাছুল। জানে বাঁচবিনে একটো।
গফুর রাগে অগ্নিগিরি। শার্দুলের মত হিংস্র চোখজোড়া দপদপিয়ে জ্বলে উঠে যেন- আগুন ওখানে। সে আগুনের সামনে বেশিক্ষণ টিকতে পারে না হিন্দুগুলো। তৎক্ষণাৎ হুড়োহুড়ি- বিছানা-পত্তর, বাসন-কোসন; হিন্দুগুলো ঘর ছাড়ে। -মালাউনের বাচ্চোরা! মুরগার কলজা লিয়ে হাঁটে! -রাগে-দুঃখে রসুলের চোখ বেয়ে পানি চলে আসে। অথচ এতদিন, কতভাবে তাকে উষ্কিয়েছে তারা
-বাপ-দাদার মাটি; এমনি ছেইড়ে দিবো!
-তু মোগো ছেইলে; তু বল- এমনি এমনি ওই বিটা সব লিয়ে লিবে! আমরো চায়ি চায়ি দিখব!
-বল তো বাপ; হেন্দু বলি মোগে পেটে সবাই লাত্থি মারে ক্যান।
-তু মোগো লাগি কিছু করবিনে রাছুল?

ওই করতে গিয়েছিল সে। কি লাভ ছিল তার! অবশ্য লাভ যে একেবারেই ছিল না তা নয়। পাড়াটাতে সর্বসাকুল্যে পাঁচঘর হিন্দু আর নয়ঘর মুসলিম পরিবার- অনেকদিন ধরে একসাথে আছে ওরা; ঝগড়া-ঝাঁটি প্রায়শই- বৃহৎ স্বার্থে সবাই এক। উপায় নেই এ ছাড়া- জায়গাটা কারো পৈত্রিক সম্পত্তি না; বাঁধের পাড়ের একফালি জমি- বার বছর ধরে বাস ওদের- ওরা জানে এটা নিরঞ্জন পাগলার। ওকে নিয়ে ভয় ছিল না। ভয় ছিল অন্যখানে- ও বংশের অন্য কেউ যদি খোঁজ নিতে আসে; আসেনি কখনো। বিপদ এল এমন জায়গা থেকে; ধারণাই ছিল না ওদের।

Thursday, October 07, 2010

ধ্বংসের পাটাতনে (১)

নচ্ছার বরষায় উত্তুরের দেওয়ালটাতে ভাঙন ধরেছে এবার। এভাবে চললে এই বর্ষা পর্যন্ত ঘরটা টিকবে কি না সন্দেহ- চিন্তায় রসুলের কপালে ভাঁজ পড়ে; আবার অনেকগুলো টাকা খসল। হায়রে নিয়তি! অথচ কি কষ্ট করেই না বেশ অনেকগুলো টাকা জমিয়েছিল সে; একখানা গাই-গরু কিনবে, দুধ বেচে টাকা জমাবে- সেই টাকায় বিয়ে করবে একটা; বয়স যে ওকে ফাঁকি দিতে বসল। মা বাবা না থাকার এই এক ঝামেলা। সব এসে খালি বলে যায়
-একখান বউ লিয়ে আয় রাছুল। রঁধি খাওয়াবিনে। ওই পর্যন্তই। তারপর আর কারো পাত্তা নেই। ওই শুনতে শুনতে বছর ছয়েক- আর কত! নিজেরই কিছু করা লাগে। -সে বাড়া ভাতে ছাই। ঘরের চালা ঠিক না করলে ঘর থাকবেনা। যার ঘরই নাই তাকে মেয়ে দিবে কোন বাপে!  এইসব সাত-পাঁচের গ্যাঁড়াকলে আটক রসুলের আকষ্মাৎ ভাবান্তর ঘটে। -ব্যাপারখানা কি? হরিপদের প্রৌঢ় বাপটা ওভাবে দৌঁড়াচ্ছে কেন? আবার কেউ মরল না তো! -অবশ্য মরাটা এখানে নৈমিত্তিক; এইতো মাস-দুই আগে সুলেখার দুটো বাচ্চা একসাথে মরল বাঁধ থেকে পড়ে- খুঁজেই পেল না কেউ; কোথাকার ঢেউ কোথায় টেনে নেয়! এবার কারটা গেল? 

বাচ্চাকাচ্চার অভাব নেই এখানে; সবসময় জন্মাচ্ছে- প্রতি মাসে দু-একটা। কার যে কয়টা; বাপ-মা নিজেও জানেনা হয়তো। বাঁচা-মরা কোন বিষয় না এখানে। প্রথম প্রথম খারাপ লাগত; এখন সব গা সওয়া। যাক। আল্লাহর মাল আল্লাই নিয়ে যায়। অত ভাবার সময় কোথায় তার? তারচেয়েও কত বড় বড় বিষয় পড়ে আছে- এই তো বেশ কিছুদিন ধরে কানাঘুষা শুনছে; ওদের পুরো পাড়াটা না কি সরকারি সম্পত্তি। বড় বাড়ির ছোট ছেইলে গফুর মোল্লা জায়গাটা কিনে নিয়েছে। আজ-কালের মধ্যে দখল নিতে আসবে। -বললেই হল! দশগ্রামের সবাই জানে এ জমির নিরঞ্জনের পৈত্রিক। বাপ-দাদা চৌদ্দ পুরুষ ধরে বাস ওদের। যদিও ও বংশের কেউ নেই এখানে; তাতে কি! -নিরঞ্জন তো বেঁচে আছে; পাগল-ছাগল মানুষ- এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়; নিশিরাতে বনে-বাদারে বাঁশি বাজায়- তারপরও, রসুলরা কি ওর দেখাশোনা করে না? অকর্মার ঢেঁকি পাগলাটাকে ওরা কি পালাক্রমে দিনে দু-বেলা খাওয়ায় না? নাহলে কবেই না খেতে পেয়ে মারা যেত। তার বদলে ওর বাপ-দাদার ভিটেয় ঘর বানিয়ে থাকছে ওরা- তাও তো বার বছর হতে চলল। নিরঞ্জনের বাপ-দাদাদের যদিও রসুল দেখে নি; হরিপদেও বাপ তো দেখেছে। সেই ছেলেবেলা থেকে একসাথে উঠা-বসা ওদের। আর এতদিন পর কেউ যদি বলে বসে-

Wednesday, October 06, 2010

গন্ধপুরাণ (৪)

মাসখানেকের মধ্যে ফান্ডের টাকা চলে এল; সাথে ইসমাইল চাচা। অমনি কি এক আশ্চর্য শক্তিতে প্রচণ্ড দৃঢ় আমার হাড় জিরজিরে মা- আমার মেয়ে আমি যেখানে খুশি বিয়ে দিব; কার কি তাতে!
মেঘলার বিয়েতে ধুমধাম হয়েছিল খুব। ও চলে যাওয়ার পর ওর হিসেবের অঙ্কটিও সোজা হয়ে উঠেছিল। অঙ্কটি আরো সোজা করে দিয়েছিল আমার সুবিবেচক বাবা- কি এক দুঃখবোধ বুকের মাঝে পুষে একমাস পরে মরেই গেল লোকটি। তারপর; দুইটি লোক। দুই হাজার টাকা। অবশ্য আমার লেখাপড়ার খরচটা মেঘলার স্বামীই চালাত। মেঘলাকেও ডাক্তার দেখিয়েছিল ওরা বেশ দামী ডাক্তার; পাঁচশ টাকা ভিজিট। একপলক দেখেই জানা হয়েছিল তাঁর। কমদামী হাতুড়েগুলোকে বেশ অনেক্ষণ গালাগালি করলেন তিনি- এ চোখের রোগ নয়। শরীরে ভিটামিনের অভাব। সাতশ টাকার মাল্টিমিটামিনেই সারে।
তারপর, অনেক বছর কেটে গেছে। দুলাভাইয়ের টাকায় পড়ে পড়ে আমি এখন বিরাট ইঞ্জিনিয়ার- কথায় কথায় টাকা উড়াই- আরো অনেক কিছু। প্রতি মুহূর্তে কত হিসেব- এইসব জায়গায় না এলে আগের কথাগুলো মনেও পড়ে না।
ভাবনার অবসরে বোন চা নিয়ে আসে। এখন অনেকটা স্বাভাবিক সে। চোখ রহস্য। চা সাজাতে সাজাতে বেশ সাবলীল ভঙ্গিতে বলে-
- আমার গা থেকে কি মাছের গন্ধ বের হয়, শোভন ?
- হঠাৎ এ কথা!
ওর চোখেমুখে কৌতুক। বেশ রহস্য মাখিয়ে সে বলে তুই তো বেশ ভালো ইঞ্জিনিয়ার; অনেক জটিল জটিল হিসেব করিস। - - একটা সোজা অঙ্ক করে দিতে পারবি ?
- বল।
- একজন ডাক্তারের ভিটি যদি পাঁচশ টাকা হয় আর এক বোতল মাল্টিমিটামিনের দাম যদি হয় সাতশ টাকা; তাহলে তোর এই ছাব্বিশ হাজার সাতশ টাকার মোবাইলের বিনিময়ে কতগুলো মেয়েকে মাছের গন্ধ থেকে বাঁচানো যাবে ?
আমি নিরুত্তর তাকিয়ে থাকি ওর দিকে। উত্তরটা সেই দিয়ে দেয়।
- তোরা তো ইঞ্জিনিয়ার; কোটি কোটি টাকার হিসেব করিস। শত-হাজারের হিসেব তোদের দিয়ে হবে না রে। কোনোদিনও না।
এককাপ চা এর ধোঁয়া ধোঁয়া বিষন্নতায় আমাকে ডুবিয়ে আবারো চলে যায়। বিছানার উপর থেকে আমার নতুন কিনা মোবাইলটি দাঁত কেলিয়ে ভেংচি কাটে যেন।
অনেকক্ষণ পর রুমে একজন মানুষ আসে- আমার মাছ ব্যবসায়ী দুলাভাই। তার কণ্ঠে বিগলিত ধ্বনি
- আরে, শালা মিয়া যে। নতুন মোবাইল। এক সে বেশিদিন ভাল লাগে না বুঝি ?
- কি যে বলেন। ভাবলাম, সারাজীবনতো আপনার কাছ থেকে নিয়েই গেলাম। এবার কিছু দিয়ে যাই।

গন্ধপুরাণ (৩)

সে দেখবে না। বড় একরোখা মেয়েটি- অনেক বড় কিছু হতে পারত হয়তো। অথচ এখানে - বিষন্নতাবিলাসী দীর্ঘশ্বাসকন্যা।  -কে দায়ী! -আমি? -আমার পরিবার? -না কি অন্য কিছু! শেষের দিনগুলোর কথা আমার মনে পড়ে যায়। অযাচিতভাবে মেট্রিকে ফেল করে বসে আমার বোনটি। সেই থেকে শুরু- একটি মাত্র ঘটনা অসম্ভব রকমের উচ্ছল মেয়েটিকে পুরোপুরি বদলে দিল। টানা দুই মাস খুব কেঁদেছিল সে- সকাল সন্ধ্যা সব সময়। কাঁদতে কাঁদতে চোখ দুটি গেল বুঝি। হয়তো তাই। -মাঝে মাঝে প্রচন্ড রকমের মাথাব্যাথা হতো ওর; মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদত। প্রথমে আমল দেয়নি কেউ। -এ তো শোক। আহা! ফেল করে বসল এত ভালো মেয়েটি! খেয়াল হলো এক বছর পর। ততদিনে সে দ্বিতীয়বারের মতো মেট্রিক ফেল আর আমার বাবা সদ্য রিটায়ার্ড। আমি অবশ্য পাশ করেছিলাম- বেশ ভালোভাবেই। কিন্তু, আমার বোন -আরে সর্বনাশ! মেয়ে তো চোখেই দেখে না- পরীক্ষা দিবে কিভাবে ?
ডাক্তার এলো।
- না! অবস্থা জটিল। অপারেশন লাগবে বোধ হয়।
আরেকজন আরো ভালো-
- এ দেশে চিকিৎসা হবে না এ রোগের। বাইরে নিতে হবে। অনেক টাকার ব্যাপার-।
বাবার মাথায় হাত। এখনো পেনশনের টাকা আসা শুরু হয়নি। তার উপর ছেলের কলেজ- দুসপ্তাহে তার বয়স দ্বিগুণ বাড়ে। আর আমার বোন; ওর নামের মতোই দিনে দিনে সে মেঘাচ্ছন্ন- শুকিয়ে অর্ধেক হতে থাকে। কি হবে এবার! এমন সময় প্রস্তাবটা আসে। বাবার বন্ধু ইসমাইল চাচা - মাছের ব্যবসা তাঁর।
মেঘলার বিয়ের ব্যাপারে অতি উৎসাহী-
- বুঝলেন ভাবী। আপনার মেয়ের জন্য এর চেয়ে ভালো ছেলে আর পাবেন না। শহরের উপর পাঁচতলা বাড়ি। চার চারটা মাছের আড়ত। আর টাকা পয়সার কথা কি বলব- অঢেল!
- ছেলের বয়স নাকি খুব বেশি?
- ছেলের আবার বয়স কি। ঐ ছেলের জন্য কত জন মেয়ে নিয়ে বসে আছে জানেন- ফিরেও দেখেনি। খালি আমি বললাম দেখে- হাজার হোক, বন্ধুর জন্য কিছু একটা তো করা লাগে।
- কিন্তু-
- আবার কিন্তু কিসের ভাবী। মেয়ের বাপ রিটায়ার্ড। তার উপর মেয়ের অবস্থা দিনে দিনে যা হচ্ছে -কিছুদিন পর তো ভালো-খারাপ কোনোভাবেই চালানো যাবে না। আবার ছেলে একটাওতো আছে। ওকে পড়ানো লাগবে না ?
- নুন আনতে পান্তা নেই- ছেলে পড়ানো।
- সেটাই তো বলছি। আল্লার রহমতে, ওদের টাকার অভাব নেই। মেয়েটা বিয়ে দেন। একটিমাত্র শালা -ওরা তো ফেলে দিতে পারবে না। আপনার ছেলের লেখাপড়ার খরচ ওরাই চালাবে।
- দেখি; আপনার বন্ধু-
- ওর কথা শুনেছেন তো মরেছেন। একমাস পর প্রোভিডেন্ট ফান্ডের টাকা হাতে আসবে -সব তো খেয়ে শেষ করে দিবে সে। আমি ওেক চিনি না! তখন মেয়ে বিয়ের টাকা পাবেন কোথায় ?
কথাগুলো মাকে জেঁকে ধরেছিল। বাবার পেনশনের দুহাজার টাকা হাতের মুঠোয় ধরে কি যেন ভাবত মা। আর আমার মেঘবতী বোন ব্যাথাওয়ালা মাথা নিয়ে কি সব জটিল হিসেব কষত সারাক্ষণ।
এক মাস সমান তিরিশ দিন, চারজন লোক, দুই হাজার টাকা- জীবনের একমাত্র হিসেব।

গন্ধপুরাণ (২)

চিৎকারটা একটু জোরেই হয়েছিল। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া দু-একটি উৎসুক মুখ গলা উঁচিয়ে দেখে। এত বড় বড় দুটো ছেলেমেয়ের বাচ্চাসুলভ আচরণে বেশ মজা পেয়েছে তারা। এতক্ষণে আমার বোনের টনক নড়ে। তড়িঘড়িতে গেইট বন্ধ করে সে- এ কাজে বেশ সিদ্ধহস্ত; দিনে কতবার যে কাজটি ওকে করতে হয়- কে জানে।
- মা কেমন আছে রে ? শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে প্রশ্ন করে সে।
- ভালোই। কাল-পরশুর দিকে আসতে পারে। আজকেই আসতে চেয়েছিল-
- নিয়ে আসলিনা কেন ?
- বাসায় গেলে তো-। অফিস থেকে সুপার মার্কেট; মোবাইল কিনে তোর এখানে।
- তোর না মোবাইল সেট আছে- বেশ দামী।
- আমি তো তোর জন্য কিনেছি।
- হঠাৎ এত সুবুদ্ধি।
- তোর মনে না থাকতে পাওে; আমার আছে। ইঞ্জিনিয়ারিং-এ চান্স পাওয়ার পর খুব খেপিয়েছিলি তুই - বেশি কিছু না; শুধু একটি মোবাইল সেট- ইঞ্জিনিয়ার সাহেব। মনে পড়ে ?

সে অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল একবার। সেখানে আশ্বিনের কালো মেঘ। তৎক্ষনাৎ মুখ ফিরিয়ে নিল- ‘ঘরে চল’।
কিছু একটা হয়েছে ওর। না জানি কোনো বিষণ্ণতা ওতে ভর করল! বিয়ের পর থেকে এমন হয়ে পড়েছে সে। অথচ আগে- 
কি উচ্ছল! সব সময় হাসত মেয়েটি; সব কিছুতেই অসাধারণ। দোষের মধ্যে একটাই- কাঁচা মাছের গন্ধ সহ্য হতো না ওর। মাছের বাজারের পাশ দিয়ে গেলেই গা গুলানো ভাব দেখাত সে। আমি ক্ষেপানোর রাজা- কথায় কথায় উস্কানি দিতাম
তোর বিয়ে হবে মাছ বিক্রেতার সাথে। ঘরভর্তি মাছ; তোর গা থেকেও মাছের গন্ধ বের হবে রে-
- ওয়াক্!
সে বমির ভাব করত। আমি মজা পেতাম। হাতাহাতিও মাঝেমধ্যে- বয়সে সে আমার এক বছরের বড়। আমার স্কুল মাস্টার বাবার সংসারে এ এক আর্শিবাদ। ঘরের সবকটি কাজই সে করত (মাছ কাটা ছাড়া)।
অংকে অসাধারণ মাথা ছিল ওর; পারতনা ইংরেজি। অবশ্য এত কাজের ফাঁকে পড়ার সময় হয়ে উঠত না ঠিকটি। আমি চির অলস- একগ্লাস পানিও ঢেলে নিয়ে খাইনি কখনো। স্বপ্নীল ছিল দিনগুলো- বোনটিকে দেখলে সেসব স্মৃতি বারবার মনের পর্দায় উঁকি দিয়ে উঠে। ভাবনার অবসরে সে প্রশ্ন তুলে
- মোবাইলটা কত দিয়ে কিনলি ?
- আরে, দাম দিয়ে কি হবে। দেখনা - এটা দিয়ে ছবি তোলা যায়, ভিড়িও করা যায়, নেট আছে-
সে তীব্রদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। ঐ দৃষ্টির সামনে নিতান্তই অসহায় আমি- বিড়ালের থাবায় বন্দী ইঁদুরছানা। কম্পিত গলা ভেদে বেরিয়ে আসে-
- ছাব্বিশ হাজার সাতশ টাকা।
সে তেমনভাবেই চেয়ে থাকে। ক্ষণপরে লম্বা এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পিছু ফেরে।
- মোবাইলটা দেখবি না!
- তুই বস। আমি চা বানিয়ে আনি।

Monday, September 20, 2010

গন্ধপুরাণ (১)

নর্দমার লাগোয়া পুরনো আমলের রংচটা পাঁচতলা বাড়িটা মূর্তিমান বিভীষিকা যেন। কোন বিকারগ্রস্থ যে এই বাড়িটা বানিয়েছিল- তার রুচিবোধের প্রশংসা করতেই হয়। স্টাইলের ছিটেফোঁটা নেই; বারান্দার শ্রী নেই; সামনে লন, ভেতরে গ্যারেজ - এমনকি পিছনের দেওয়ালে প্লাস্টার পর্যন্ত নেই। চর্তুদিকে অজগরের মতো কালো বুকের নর্দমা জড়ানো বাড়িটা যেন দ্বীপ এক। তার উপর সিমেন্টের স্লাইড ফেলে আসা যাওয়ার পথ। সেখানে সান্ত্রী - নিশিদিন ঘর আগলে রাখা আশি বছরের বয়োঃবৃদ্ধ মরচে ধরা লোহার পেল্লাই গেইট; খুলতে বাঁধতে বিকট ধাতব শব্দ- মাথা ধরে আসে। তারপর ও মাসে দু-একবার আমাকে এখানে আসতে হয়। এ যন্ত্রণা হয়তো সারাজীবন চলবে। গত বিশ বছরে যেখানে এ বাড়ির ক্রমশ অবনতি ছাড়া সামান্যতম উন্নতিও হয়নি সেখানে উন্নতির আশা মরীচিকা এক। সেই কত আগে একবার চুনকাম করা হয়েছিল- স্থানে স্থানে শেওলা ধরা দেওয়ালগুলো এখনো সে স্বাক্ষী বয়ে আছে। এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা সেখানে। পুরো এলাকাটাই বিষণ্ণতা ভরা - পা রাখলেই মন খারাপ হয়ে উঠে। কি ফুরফুরে মেজাজ ছিল তখন। নতুন মোবাইল কিনেছি। আর এখানে এসে- বাড়িটাই অপয়া, বিষণ্ণতার স্বর্গরাজ্য। নর্দমার পেট গুলানো গন্ধলেবাস গায়ে চাপিয়ে কলিংবেলে হাত রাখা মাত্রই সে বিষণ্নতা আমাতে জাকিয়ে বসল। কানের চারপাশে রিক্সার টুং-টাং, ট্যাক্সির ভটভট, হকারের হাঁকডাক। ঘড়ি ধরা পাঁচ মিনিট সেই নরকুন্ডে দদ্ধ হবার পর যখন দ্বিতীয়বারের মতো বেল চাপতে যাব- লৌহ পালোয়ানের ধাতব আর্তনাদ। এবারও সে - আমি আওয়াজ শুনেই বুঝতে পারি। এ বাড়িতে মেয়েটার দাম নিতান্তই কম। এ কথা সে কখনো মুখফুটে বলেনি; ইশারায়ও নয় - তার চোখ সব কিছু জানিয়ে দেয়। আমার সামনে অনেক অনেক কাজ করে সে; না জানি পিছনে আরো কত !
- বাড়িতে দুটো কাজের লোক থাকতে তোর এতো কষ্ট করে গেইট খোলার দকার কি ? আমার তো মনে হয় তোকে এ বাড়িতে গেইট খোলার জন্যই রাখা হয়েছে।
- গেইট সব সময় আমি খুলি; তোকে বলল কে ? আসলে বেল শুনে আমি বুঝে ফেলি এটা তুই। আমার ছোট ভাই আমাকে দেখতে এসেছে - আমি কি না এসে পারি।
- কিন্তু, আমি তো অন্যদের মতো একবার বেল চাপি। বোঝার প্রশ্নই আসে না।
- দেখ - এটা বুঝতে পারলে তুই তো আমার সমান হয়ে যেতি; ছোট ভাই থাকতি না। একে বলে ট্যালিপ্যাথি-
- আরে সর্বনাশ! তাহলে তো তোকে চেম্বার খুলে দিতে হয়। টেলি বিশেষজ্ঞ মেঘলারাণী-
- ফাজিল কোথাকার। বড় বোনের সাথে শয়তানি!
বলতে গিয়ে সে অভ্যেসবশত বেশ জোরে আমার কান টেনে ধরে।
- উঃ! লাগে তো! ছেড়ে দে না বোন-