Monday, September 20, 2010

গন্ধপুরাণ (১)

নর্দমার লাগোয়া পুরনো আমলের রংচটা পাঁচতলা বাড়িটা মূর্তিমান বিভীষিকা যেন। কোন বিকারগ্রস্থ যে এই বাড়িটা বানিয়েছিল- তার রুচিবোধের প্রশংসা করতেই হয়। স্টাইলের ছিটেফোঁটা নেই; বারান্দার শ্রী নেই; সামনে লন, ভেতরে গ্যারেজ - এমনকি পিছনের দেওয়ালে প্লাস্টার পর্যন্ত নেই। চর্তুদিকে অজগরের মতো কালো বুকের নর্দমা জড়ানো বাড়িটা যেন দ্বীপ এক। তার উপর সিমেন্টের স্লাইড ফেলে আসা যাওয়ার পথ। সেখানে সান্ত্রী - নিশিদিন ঘর আগলে রাখা আশি বছরের বয়োঃবৃদ্ধ মরচে ধরা লোহার পেল্লাই গেইট; খুলতে বাঁধতে বিকট ধাতব শব্দ- মাথা ধরে আসে। তারপর ও মাসে দু-একবার আমাকে এখানে আসতে হয়। এ যন্ত্রণা হয়তো সারাজীবন চলবে। গত বিশ বছরে যেখানে এ বাড়ির ক্রমশ অবনতি ছাড়া সামান্যতম উন্নতিও হয়নি সেখানে উন্নতির আশা মরীচিকা এক। সেই কত আগে একবার চুনকাম করা হয়েছিল- স্থানে স্থানে শেওলা ধরা দেওয়ালগুলো এখনো সে স্বাক্ষী বয়ে আছে। এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা সেখানে। পুরো এলাকাটাই বিষণ্ণতা ভরা - পা রাখলেই মন খারাপ হয়ে উঠে। কি ফুরফুরে মেজাজ ছিল তখন। নতুন মোবাইল কিনেছি। আর এখানে এসে- বাড়িটাই অপয়া, বিষণ্ণতার স্বর্গরাজ্য। নর্দমার পেট গুলানো গন্ধলেবাস গায়ে চাপিয়ে কলিংবেলে হাত রাখা মাত্রই সে বিষণ্নতা আমাতে জাকিয়ে বসল। কানের চারপাশে রিক্সার টুং-টাং, ট্যাক্সির ভটভট, হকারের হাঁকডাক। ঘড়ি ধরা পাঁচ মিনিট সেই নরকুন্ডে দদ্ধ হবার পর যখন দ্বিতীয়বারের মতো বেল চাপতে যাব- লৌহ পালোয়ানের ধাতব আর্তনাদ। এবারও সে - আমি আওয়াজ শুনেই বুঝতে পারি। এ বাড়িতে মেয়েটার দাম নিতান্তই কম। এ কথা সে কখনো মুখফুটে বলেনি; ইশারায়ও নয় - তার চোখ সব কিছু জানিয়ে দেয়। আমার সামনে অনেক অনেক কাজ করে সে; না জানি পিছনে আরো কত !
- বাড়িতে দুটো কাজের লোক থাকতে তোর এতো কষ্ট করে গেইট খোলার দকার কি ? আমার তো মনে হয় তোকে এ বাড়িতে গেইট খোলার জন্যই রাখা হয়েছে।
- গেইট সব সময় আমি খুলি; তোকে বলল কে ? আসলে বেল শুনে আমি বুঝে ফেলি এটা তুই। আমার ছোট ভাই আমাকে দেখতে এসেছে - আমি কি না এসে পারি।
- কিন্তু, আমি তো অন্যদের মতো একবার বেল চাপি। বোঝার প্রশ্নই আসে না।
- দেখ - এটা বুঝতে পারলে তুই তো আমার সমান হয়ে যেতি; ছোট ভাই থাকতি না। একে বলে ট্যালিপ্যাথি-
- আরে সর্বনাশ! তাহলে তো তোকে চেম্বার খুলে দিতে হয়। টেলি বিশেষজ্ঞ মেঘলারাণী-
- ফাজিল কোথাকার। বড় বোনের সাথে শয়তানি!
বলতে গিয়ে সে অভ্যেসবশত বেশ জোরে আমার কান টেনে ধরে।
- উঃ! লাগে তো! ছেড়ে দে না বোন-