জঙ্গলের আবছায়ায় পেট খালি করে সে। আঃ! শান্তি! তখনই বেজে উঠে সুরটা- একটানা একঘেঁয়েভাবে ইনিয়ে বিনিয়ে কেঁদে মরে, “বৈদেশ গেলে আমি তোমার সংগ ছাড়ুম না রে- সংগ ছাড়ুম না।” হায়রে নিরঞ্জন- কেউ তার সংগ ছাড়ল না; না চন্দ্ররাত, না পুকুরপাড়, না বাঁশি- সঙ্গ ছাড়ল বনমালীর রাধিকা- যার জন্য এত সুর, এত কান্না, ইনিয়ে-বিনিয়ে বাঁশির রোদন; সাহা বাড়ির মাধবী। আহারে! কত রাত ধরে মেয়েটা কেবল শুনেই গেল, শুনেই গেল- রাধিকা হয়েছিল একদিন; গভীর রাতে ছুটে বেরিয়েছিল প্রায়। শেষরক্ষা হয়নি আর- মায়ের হাতে ধরা। সব্বোলাশ! উঠতি মেয়ে- বাঁশিতে পায়িছে। আল ঘলে লাখা যাবি লা। -তারও সপ্তাহ্ দুয়েক পরে পালকিতে চেপে মেয়েটা অন্যজনার। নিরঞ্জনের বিরাম নেই। -এ এক নেশা; এক মোহ- বাঁশির মোহ- রাতের মোহ- চাঁদের মোহ- খালিগায়ে কাঁপন ধরানো শিরশিরে বাতাসের মোহ। পুকুরের জল টলটল, ধারটাতে হাস্নাহেনার ঝাড়- এক উগ্র ধরণের মিষ্টি গন্ধে পরিবেশটা আরেকটু ভারী, আরেকটু স্বপ্নীল- এর কোনটাকে অস্বীকার করবে সে! হয়তো এর পুরোটাই স্বপ্ন- উগ্র ধরণের মিষ্টি স্বপ্ন; চোখে জ্বালা ধরানো চাঁদ, বুকে ব্যাথা জাগানো বাঁশি, গায়ে কাঁপন ধরানো ঝিরঝিরে হাওয়া, মস্তিষ্ক ভারী করে তোলা উগ্র ধরণের হাস্নাহেনা- চাঁদটা আরেকটু পষ্ট হলে বাঁশিটা আরেকটু করুণ, আরেকটু গভীর- সুরটা তাকে চেপে ধরে; বুকের গভীরতম সূক্ষ প্রদেশে নিজের অজান্তে লালন করে চলা একটি স্থির চিত্র ছিন্ন-ভিন্ন-বিদীর্ণ করে তোলে- একান্ত ব্যক্তিগত একটি। না! কিছুই হওয়া গেল না জীবনে- না কেষ্ট, না মধাব; অন্ততঃ গোষ্ঠের রাখাল হলেও- হায়রে কেষ্ট; বুকের ভেতর কি ব্যাথাটাই না ছিল তার- অনেক বেশি- বাঁশির সুরে ঝরে ঝরে পড়ত- ছুটে বেড়াত দিগবিদিগ- কিছুটা ভালবাসা সেখানে; রাধা কিভাবে সইবে এত! আর এখানে, কোন দূর পাড়াগাঁয়ে এক মধ্যবয়সী দোকানদারের ঘামে ভেজা লোমশ বুকের নিচে একজোড়া শক্ত বাহুর পিঞ্জরে বন্দী তার রাধা। লোকটা সব খেয়ে নিল তার- বুক-গলা-পেট-হাত-পাও- সব। লোকটা ঠোঁট খেল তার, বাতাবি লেবুর কোঁয়ার মত বাঁকা-বাঁকা ঢেউ খেলানো ঠোঁট দুটো; এমনকি কানদুটো- খাবেই তো। কান থাকলে মেয়েটা বাঁশি শুনবে, ঠোঁট থাকলে বলতে চাইবে, পা থাকলে ছুটে আসবে- এত করতে দেওয়া হবে কেন ওকে! জানে না সে; কিছুই না। নেশায় পেয়েছে ওকে; তীব্র নেশা। নেশায় পেয়েছে রসুলকেও- ধীরে ধীরে সে এগিয়ে চলে; জঙ্গল থেকে বেরিয়ে বিশাল ধানক্ষেতের মাঝখান দিয়ে সাপের মত একেবেঁকে চলা আল ধরে- নিরঞ্জন তখনো আধামাইল দূরে; তবে, সুরটা- ওর বাঁশিটা; অনেক কাছে- বুকের ঠিক অন্তঃস্থলে- সে ক্রমাগতই এগিয়ে চলে। আরো কিছুটা; আকষ্মাৎ অন্যরূপ- তার ঠিক পিছন পিছন কে বা কারা! ভেজা ঘাসের উপর সমবেত পদশব্দ- থপথপ, খসখস; আরেকটা মৃদু গুঞ্জন- প্রচন্ড ভয়ে তার শিরদাঁড়া কেঁপে কেঁপে উঠে। পিছনে তাকিয়ে দেখার সাহস হয় না আর- ঝেড়ে দৌড় দিবে না কি? সহসাই তার জটিল ভাবনা-চিন্তার বেড়াজাল থেকে মুক্তি পায় সে- কিছু বুঝে উঠার আগেই, ধপ্- কেউ একজন সজোরে মাথায় মেরে বসে তার। সে হুমড়ি খেয়ে পড়ে এবং উঠে দাঁড়ানোর আগেই শক্ত কতগুলো হাত মাটিতে চেপে ধরে- চিৎ করে; এবার সে দেখতে পায় তাদের- চাঁদের রঙের পোষাক সবার; একই ধারার দাঁড়ি- এ যে হাজারখানা গফুর; হাতে তাদের লম্বা তলোয়ার- চাঁদের আলোয় চকচকিয়ে উঠে। এখানে রসুল কোরবানির গরুর মতন- চেয়ে চেয়ে দেখে; আকষ্মাৎ আর্তচিৎকার- প্রচন্ড রকমের; বাঁশির আওয়াজ ছাপিয়ে, আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে- তারা যেমন এসেছিল তেমনি চলে যায়।
অনেকটা ধ্বংসের পাটাতনে যখন অমানিশা; দৃশ্যটি চিতল মাছের মত ভুস্ করে রসুলের স্মৃতির পর্দায় ঘাঁই দিয়ে উঠে। একগাদা কিলবিলে শরীর, হাঁড়ে-হাঁড়ে ঠকঠক, পায়ে পায়ে থপথপ-। উপরে গোল একটা চাঁদ, নিচে মাতাল বাঁশির সুর- সবুজ ঘাসের বুকে একরাশ লাল রক্তের উষ্ণতায় তড়পাতে তড়পাতে তাদের কোনটাই উপভোগ করা হয়ে উঠেনা তার।