মাসখানেকের মধ্যে ফান্ডের টাকা চলে এল; সাথে ইসমাইল চাচা। অমনি কি এক আশ্চর্য শক্তিতে প্রচণ্ড দৃঢ় আমার হাড় জিরজিরে মা- আমার মেয়ে আমি যেখানে খুশি বিয়ে দিব; কার কি তাতে!
মেঘলার বিয়েতে ধুমধাম হয়েছিল খুব। ও চলে যাওয়ার পর ওর হিসেবের অঙ্কটিও সোজা হয়ে উঠেছিল। অঙ্কটি আরো সোজা করে দিয়েছিল আমার সুবিবেচক বাবা- কি এক দুঃখবোধ বুকের মাঝে পুষে একমাস পরে মরেই গেল লোকটি। তারপর; দুইটি লোক। দুই হাজার টাকা। অবশ্য আমার লেখাপড়ার খরচটা মেঘলার স্বামীই চালাত। মেঘলাকেও ডাক্তার দেখিয়েছিল ওরা বেশ দামী ডাক্তার; পাঁচশ টাকা ভিজিট। একপলক দেখেই জানা হয়েছিল তাঁর। কমদামী হাতুড়েগুলোকে বেশ অনেক্ষণ গালাগালি করলেন তিনি- এ চোখের রোগ নয়। শরীরে ভিটামিনের অভাব। সাতশ টাকার মাল্টিমিটামিনেই সারে।
তারপর, অনেক বছর কেটে গেছে। দুলাভাইয়ের টাকায় পড়ে পড়ে আমি এখন বিরাট ইঞ্জিনিয়ার- কথায় কথায় টাকা উড়াই- আরো অনেক কিছু। প্রতি মুহূর্তে কত হিসেব- এইসব জায়গায় না এলে আগের কথাগুলো মনেও পড়ে না।
ভাবনার অবসরে বোন চা নিয়ে আসে। এখন অনেকটা স্বাভাবিক সে। চোখ রহস্য। চা সাজাতে সাজাতে বেশ সাবলীল ভঙ্গিতে বলে-
- আমার গা থেকে কি মাছের গন্ধ বের হয়, শোভন ?
- হঠাৎ এ কথা!
ওর চোখেমুখে কৌতুক। বেশ রহস্য মাখিয়ে সে বলে তুই তো বেশ ভালো ইঞ্জিনিয়ার; অনেক জটিল জটিল হিসেব করিস। - - একটা সোজা অঙ্ক করে দিতে পারবি ?
- বল।
- একজন ডাক্তারের ভিটি যদি পাঁচশ টাকা হয় আর এক বোতল মাল্টিমিটামিনের দাম যদি হয় সাতশ টাকা; তাহলে তোর এই ছাব্বিশ হাজার সাতশ টাকার মোবাইলের বিনিময়ে কতগুলো মেয়েকে মাছের গন্ধ থেকে বাঁচানো যাবে ?
আমি নিরুত্তর তাকিয়ে থাকি ওর দিকে। উত্তরটা সেই দিয়ে দেয়।
- তোরা তো ইঞ্জিনিয়ার; কোটি কোটি টাকার হিসেব করিস। শত-হাজারের হিসেব তোদের দিয়ে হবে না রে। কোনোদিনও না।
এককাপ চা এর ধোঁয়া ধোঁয়া বিষন্নতায় আমাকে ডুবিয়ে আবারো চলে যায়। বিছানার উপর থেকে আমার নতুন কিনা মোবাইলটি দাঁত কেলিয়ে ভেংচি কাটে যেন।
অনেকক্ষণ পর রুমে একজন মানুষ আসে- আমার মাছ ব্যবসায়ী দুলাভাই। তার কণ্ঠে বিগলিত ধ্বনি
- আরে, শালা মিয়া যে। নতুন মোবাইল। এক সে বেশিদিন ভাল লাগে না বুঝি ?
- কি যে বলেন। ভাবলাম, সারাজীবনতো আপনার কাছ থেকে নিয়েই গেলাম। এবার কিছু দিয়ে যাই।
No comments:
Post a Comment