কথাটা কানে যাওয়া মাত্রই বেশ কয়েক বছর আগের একটি ঘটনার কথা আকাশের মনে পড়ে যায়। মনের পর্দায় একটি ছবি- তন্ময়। ঝুমুর সবেমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখন ওর মুখে ব্রণ ছিল না; মুখ অনেক উজ্জ্বল। ছিল অহংকার- ভয়ঙ্কর রকমের। হয়তো তা রূপের; হয়তো পূর্ববর্তী রেজাল্টের- এখনকার ঠিক বিপরীত। কাউকে পাত্তা দিত না সে। কথাবার্তা যৎসামান্য- তাও ভাব দেখানো।
এর মাঝে এক ক্লাসমেটের সাথে ওর সখ্যতা; হতে পারে বন্ধুত্ব, অথবা অন্যকিছু। এমনও হতে পারে; ছেলেটার পক্ষ থেকে প্রেম- ঝুমুরের একধরণের মজা। তন্ময় ঝুমুরকে ভালবাসত- প্রচন্ডভাবে। পাগলের মত ফোন করত; নিজের কাজ ফেলে ওর সাথে ঘুরে বেড়াত- সবসময়- সবখানে-। ঝুমুরও তন্ময়ের কথা খুব বলত। সবকিছু ঠিকই ছিল।
ঝড় উঠল আচমকা। কিছু একটা ঘটেছিল ওদের মধ্যে। কি ঘটেছিল কেউ জানে না- ওর ক্লাসমেটরা, এমনকি আকাশ। ঝুমুরের চোখে তখন অন্য ভাষা। কিছু একটা বলার জন্য বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল তন্ময়; ঘন্টার পর ঘন্টা একটানা ফোন করত সে- ঝুমুর রিসিভ করত না। ক্লাসে কিছু বলতে চাইলে পাশ কাটিয়ে চলে যেত। অস্বাভাবিক পরিস্থিতি! কয়েকদিন পর এক সন্ধ্যায় ছেলেটি ছাদ থেকে পড়ে মারা গেল। সবাই তা জানত। কথাটাও সত্যি। - অন্তরালে অন্যরূপ। সেই সন্ধ্যায় চূড়ান্ত রকমের আবেগে পেয়ে বসেছিল তন্ময়কে। অনেক্ষণ ধরে একটানা কল করেছিল সে; ঝুমুর রিসিভ করেনি। একসময় ঝুমুরের মোবাইলে একটা ম্যাসেজ; তুমি যদি এই কল রিসিভ না কর, আমি সবকিছু এখানেই শেষ করে দিব। দুই মিনিট পর আরেকটা কল; রিসিভ করেনি ঝুমুর- প্রয়োজন মনে করে নি। অনেক্ষণ পর তার মন হয়তো একটু নরম হয়েছিল। ততক্ষণে সব শেষ।
ভার্সিটির স্টুডেন্টরা অসাধারণ! বন্ধু হারানোর বেদনায় মর্মাহত ওরা একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছিল; চাঁদা তুলে। সেই সমব্যাথী জনসমুদ্রে ঝুমুরও ছিল। ঝুমুরকে ক্ষমা করেছিল ওরা (ট্রয় ভেস্তে যাক; হেলেনের জয়-জয়কার)। তন্ময়ের অতৃপ্ত দুঃখবোধের সামান্যতম স্পর্শও ওরা ঝুমুরের গায়ে লাগতে দেয় নি। কত আগে- এতদিনে সবাই ভুলে বসেছে। ভুলেনি তন্ময়ের বাবা-মা (একমাত্র সন্তান তাঁদের) আর আকাশ (অপ্রয়োজনীয় মনে রাখা)। ঝুমুর তখনো একটানা বকে চলছে
- তুই বলতে পারবি না কারো ক্ষতি আমি করেছি। ওরা যদি-
ঝুমুরের পরবর্তী শব্দগুলো মুখেই আটকে থাকল। ততক্ষণে উদভ্রান্তের মত চিৎকার শুরু করেছে আকাশ।
- ইউ আর নট সাপোজড টু ডু সো। ইউ আর অ্যা মার্ডারার।
ঝুমুর স্তম্ভিত। হঠাৎ কি হল আকাশের। এমন শুরু করেছে কেন সে! ওদিকে শব্দঝড়-
- তুমি কিছুই করনি। শুধু একটা ছেলেকে সুন্দরভাবে মৃত্যুর দ্বারে ঠেলে দিয়েছিলে। সে তোমাকে ভালবাসত- সত্যিকারভাবে। তুমি বুঝতে পার; কি পরিমাণ কষ্ট নিয়ে মরেছিল ছেলেটি! কিছুই করনি তুমি। শুধু একটি লাইফ ধ্বংস করেছ।
বলতে গিয়ে প্রচন্ড আক্রোশে ঝুমুরের মোবাইল মেঝেতে ছুঁড়ে টুকরো টুকরো করতে থাকে আকাশ। হতবিহ্বল ঝুমুর কম্পমান চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।
এরপর- আকাশ ভেঙে পড়ে। সামনের ভাঙা মোবাইলের টুকরোগুলো তখন ওর চোখে ভালবাসার চোরাবালিতে হারিয়ে যাওয়া তন্ময় অথবা অন্য একজন। হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে সে। ওর কান্নাভরা গলা ভেদে ধর্মীয় সঙ্গীতের মত অস্পষ্ট আকুতি- বৃষ্টি, তুমি মেঘ হবে!