এরপর- আকাশের সত্যি সত্যিই মন খারাপ হয়ে গেল। সে খায় না, ঘুমায় না; লেখাপড়া, ক্রিকেট, কম্পিউটার- কিছুই না। সারাক্ষণ কানের কাছে মোবাইল;”দুঃখিত, এই মুহূর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।” Ñ তবে কি, বৃষ্টি এখন পূর্ণিমার চাঁদ! প্রথমে কেউ বুঝে উঠেনি। যখন বুঝল; ততদিনে দুরন্তপণা হাস্যোচ্ছল ছেলেটি কমপ্লিট ভেজিটেবল। কি এক বিষণœতা ওকে ভর করেছিল সে নিজেও হয়তো জানে না। কারো সাথে কথা বলে না সে। অনুভূতিহীন পাথরখন্ড এক; পুরো পৃথিবীর সাথে আড়ি ওর।
পাথরটিতে ফুল ফুটিয়েছিল ঝুমুর- আকাশের কাজিন। বয়সে তিনবছরের বড়। ছোটবেলা থেকে জটিল সম্পর্ক ওদের। দেখা হলেই ভেংচি কাটা, হাতাহাতি, কথায় কথায় ক্ষেপানো- ফলাফল; মুখভার সারাদিন। পরে ওদের সম্পর্ক এতই ভাল হয়েছিল; যাকে বলে হরিহর আত্মা। মাস চারেক তাদের যোগাযোগ ছিলনা। ঝুমুর প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেনি। ভেবেছিল- এটা একধরণের রসিকতা। যখন দেখল এ আকাশ অন্যরকম অপরিচিত একজন; খুব কষ্ট পেয়েছিল সে। এক আত্মবিশ্বাস ওকে ভর করেছিল তখন; আকাশকে ফিরিয়ে আনবেই। অনেকটা চ্যালেঞ্জ দিয়ে আকাশকে নিয়ে এসেছিল নিজের বাসায়। সেই থেকে আকাশ ওর সাথে।
ইদানিং স্রোতধারা অন্যমুখী। আকাশ এখন অনেকটা সুস্থ (কঁচি ডাবের ভিতরের শাঁসটুকু বের করে নিলে যেমনটা হয়)। একটা কাজ খুঁজে পেয়েছে সে; হঠাৎ করেই। ক্রেডিট ঝুমুরের । এমনিতে ঝুমুরের চেহারাটা মোটামুটি; ফর্সা গোলাকার মুখ, পাতলা ঠোঁট, অনুন্নত নাক, দু-চারটি ব্রণের দাগ, বাম গালে তিল- সবমিলিয়ে আহামরি কিছু নয়। তবে, ওর এক অতুলনীয় ঐশ্বর্য আছে- একজোড়া চোখ- ধবধবে সাদা; তাজমহলের চেয়েও উজ্জ্বল (তাজমহল তো নিষ্পন্দ পাথর। কিন্তু, এ জীবন্ত! কৃষ্ণগহ্বরের সর্বগ্রাসী আকর্ষণ )। মাঝখানে ব্ল্যাক পার্ল- গ্রীষ্মের দুপুর-দিঘির থমথমে গভীরতা। নিখুঁত সে চোখজোড়া। প্রতিটি চাহনিতে, প্রতিটি ভঙ্গীতে, প্রতিটি ইশারায় আদি-অকৃত্রিম-অমিমাংসিত রহস্য। দুই সপ্তাহ্ ধরে সেই রহস্য আকাশকে ফাঁদে ফেলেছে।
আকাশ এখন পুরোদস্তুর শিল্পী। ঘন্টার পর ঘন্টা ক্লান্তিহীন- একের পর এক স্কেচ করে সে; এক জোড়া চোখের; একটি মুখের অনেক অনেক স্কেচ। স্কেচের মাত্রাতিরিক্ততায় সেই মুখের প্রতিটি বিন্দু তার মুখস্ত হয়ে যাওয়ার কথা- বিরক্তি ধরে না। তার একটি কারণ হতে পারে চুল। চোখের ধরণ বদলানো যায় না, মুখের শেইপ পাল্টানো যায় না, তিলগুলোকে ইচ্ছেমত বিউটি স্পট বানানো যায় না- বদলানো যায় চুল; চুলের স্টাইল। কখনো দু-একটা চুল বাতাসে উড়ে, একটা নাকের পাশ দিয়ে ঠোঁটের প্রান্ত ছুঁয়ে যায়। মাঝেমধ্যে জ্বলন্ত সর্পিণী। আবার, পিঠময় ছড়িয়ে দিলে পতেঙ্গা বিচের মরা-মরা ঢেউ। আকাশের এমনটাই মনে হয়। নরম বিছানার উষ্ণ কোমলতায় গা টেনে সে অফসেটে পেন্সিল বুলোয়; ঝুমুর বিছানার লাগোয়া সোফার কিনারায় পিঠ ঠেকিয়ে মেঝেতে পা টেনে মোবাইলে কথা বলে। ঘন্টার পর ঘন্টা সে কথা বলে যেতে পারে; ক্লান্তিহীন- রাউন্ডে রাউন্ডে কথা। মোবাইলের চার্জ শেষ হয়ে এলে পরে চার্জার লাগিয়ে সে কথা বলে। রাউন্ডের দীর্ঘসূত্রতায় আকাশের তন্দ্রামতো চলে আসে। বিছানার উষ্ণ কোমলতায় ভারী-ভারী চোখে ঘুম-ঘুম; নিদ্রাদেবীর স্নেহচুম্বন। ঘন্টাখানেকের স্বপ্নবিচরণ শেষে আলস্যভরা আঙ্গুলের সচলতায় হলুদ পেন্সিলের কাগজবিচরণ। ধীরে ধীরে একটি মুখের ছত্রছায়ায় একজোড়া মায়াবী চোখ পুরো ঘরজুড়ে রহস্য ছড়াতে থাকে।
ঝুমুরের তখনো একই স্টাইল। কলারের অভাব হয় না ওর। রয়েল বেঙ্গলের এই দেশে ছেলেরা সব বাঘ; নরখাদক নয়- নারীপিয়াসী। নারীকন্ঠ ওদের পাগল করে তোলে। উন্মাদের মত তারা ফোন করে চলে; ধার করে- এমনকি সবকিছু বিক্রি করে দিয়ে হলেও। এ এক নেশা। ঝুমুর বিষয়টা বেশ ভালভাবেই বুঝে। আরো অনেককিছু বুঝে সে Ñ ছেলেদের দূর্বলতাটা কোথায়? রাতের মোহময়তায় কাকে ঠিক কোন কথাটি বললে তার কমপ্লিট ভাইব্রেটিং সিস্টেম ধ্বংস হয়ে পড়ে? এ একধরণের মজা; দূর্বলতাগুলোর হান্ড্রেড পার্সেন্ট বেনিফিট নেয় সে। অবশ্য, নেওয়ার মত অনেককিছু আছে ওর মধ্যে। কথা বলতে পারে ভাল। আর- কন্ঠ আছে! বুকের ভিতরে ভীতু-ভীতু শিহরণ তোলা রিনরিনে কন্ঠস্বর। গলায় একধরণের কম্পন তুলে সে কথা সাজায়-
গেইজ করুন তো আমি কে? -উঁহু, হল না। -আপনার গেইজ এত খারাপ! -আপনার জায়গায় আমি হলে কিন্তু ঠিকই চিনে নিতাম। -বিশ্বাস হচ্ছে না! -আচ্ছা, আরেকটু সহজ করে দিচ্ছি । অনর্গল রোমান্স বর্ষে সে; ওর সে ক্ষমতা আছে। প্রতিদিন এই ঘরে অনেক ঘটনা ঘটে- অনেক কথা, অনেক ধরণের খেলা; অনেক অভিনয়। কতিপয় উন্নততর মস্তিষ্কের বিকারগ্রস্থতায়; এক রহস্যময় নারীকন্ঠের ইন্দ্রজালে অবিরাম অর্থহীন অসংলগ্নতা। হয়তো ঝুমুরের মায়াজালে অথবা অন্য কারো ধ্বংসকাব্যময়তায় এখানে দিগ্ভ্রষ্ট বসন্তের আনাগোনা। কবে এর শুরু; আকাশ ঠিক মনে করতে পারে না। তবে ঝুমুরের রাজ্যপট ইতিমধ্যে মোবাইলের গন্ডি ছাড়িয়ে ইন্টারনেটে শাখা মেলেছে। বিভিন্ন নামে তার অনেকগুলো ই-মেইল এড্রেস আছে। প্রতিনিয়ত হৃদয় কাঁপানো মেইলগুলো বিভিন্ন লোকের মেইলবক্সে ফণা মেলে; প্রতিনিয়ত হৃদয়জলে ভো আকুতিপূর্ণ সব উত্তর আসে। মিডিয়াটিতে ঝুমুর সবচেয়ে বেশি মজা পায়। ক্রিয়েটিভিটি আছে; কষ্টের কথা লাল কালিতে, ভালবাসার নীল। আরো কত কিছু; গিটিং কার্ড, পিকচার মেসেইজ-।
No comments:
Post a Comment