আমার ধারণাই ঠিক ছিল। ওদের একজন ইসমাইল মিয়া- সারাদিন ধর্মকর্ম নিয়ে থাকে, নিজে রান্না করে খায়; কারো সাতেও নেই পাঁচেও নেই। অন্যজন আব্বাস, মাঝেমধ্যে থলেভর্তি কি সব নিয়ে আসে- চলেও যায়। থাকুক ওরা ওদের মত, ওদের কাব্যময়তায়।
সেই বসন্তে সাড়া পড়ে যায়। এখানে চন্দ্রোৎসব হবে। ভরা পূর্নিমাতে বজরায় বজরায় ভরে উঠবে এই জলরাশি- অগণিত লোক সেখানে। কি আশ্চর্য! আমার কাব্যধারা সবাতে ছড়াল কিভাবে? -আমি বুঝিনা।
উৎসবের বেশ আগে থেকে জায়গাটা লোকে লোকারণ্য। লোক বাড়ে আমার বাড়িতে- একই পোষাকের একই রকম লোক। উৎসবের সন্ধ্যায় বাড়িটা যেন কারখানা। একগাদা পাউডার, একরাশ তরল, এটা-সেটা; কিছু একটা করে তারা। মাঝরাতে দলবেঁধে চলে যায় কয়েজন। আমি তখন খোলা বারান্দায়- আরো কত-শত লোকের মতন চন্দ্রবিলাসী একজন। আজ নদী পরিপূর্ণা; বুক ভরে আছে বজরায়। পূর্বপুরুষের বজরাগুলোর মত; আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখি- দেখি- দেখতেই থাকি। আকষ্মাৎ দৃশ্যপট পাল্টে যায়- আমার চোখের সামনে। প্রচন্ড শব্দে আগুন জ্বলে উঠে কয়েকটি বজরায়। তব্রি আর্তনাদ সেখানে; নরক বুঝি পৃথিবীতে নেমে এল। -এর কথাই বলেছিল সোনাই; তখন বুঝিনি আমি। যখন বুঝলাম, ততক্ষণে তার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছিল।
ক্ষণপরে ইসমাইল দৌড়ে এল-
- একটা ঘাপলা পেকেছে, জনাব। পুলিশ সব জেনে ফেলেছে। এখন হামলা হবে। গুল্লি চালাবে তারা।
- তাহলে!
- আপনার নেমক খেয়েছি অনেকদিন। ফেলে গেলে হারামি হয়ে যায়। যা পারেন নিয়ে নেন। পালাতে হবে এখন।
এই প্রথম আমি উপলদ্ধি করি, কতটা অসহায় আমি। আমার সকল তেজ, সকল বাক্যবাণ ঠাট্টার মত শব্দ করে যেন। এক বিশাল নৌকায় চড়ে কতগুলো মানুষরূপি দানবের সাথে চোরের মত পালাতে থাকি আমি। পিছনে পুলিশের অন্ধ-আস্ফালন। এই পাহাড়ী জনপদে বিশাল একটা বাড়ি ছিল আমার; বেশ লোভনীয়। হয়তো সেটাই আমার অপরাধ; নয়তো এ নারী আত্মার অভিশাপ।- যে অভিশাপ কুড়িয়েছিল আমার পূর্বপুরুষের দল; তার মাশুল দিতে হল আমাকে আজ- কড়ায় গন্ডায়।
ভালই হয়েছে। ও বাড়িতে মিউজিয়াম হবে; লোকেরা আসবে- আরো কি সব যেন। হয়তো আমিও একদিন আসব, হয়তো না। বাদ থাক সে কাব্যকথা।
মাথা উঁচিয়ে আমি নদীর দিকে তাকিয়ে থাকি। সেখানে অবাক বিস্ময়; কয়েক ফোঁটা চোখের জল- একটু বিষণ্ণতা। সে বিষণ্ণতায় ডুবতে ডুবতে আমি একটু একটু করে এগিয়ে যেতে থাকি - কোন এক অসম্ভবের পথে।
No comments:
Post a Comment