Friday, January 01, 2021

বৃত্তায়ন (১)

এক মেয়েলি কন্ঠস্বর আকাশের সর্বনাশ ডেকেছিল। প্রতি রাতে ফোন করত মেয়েটি।  ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলে যেত; সারারাতভর । কত কথাই না বলত তারা-

আমাদের কলেজ হোস্টেলের নিয়মকানুন তো খুব কড়া ছিল। একবার হল কি; মাঝরাতে আমরা পাঁচজন বারান্দায় হৈ-চৈ  ফেলে দিয়েছিলাম। এমন সে চিৎকার - সুপার স্যার কাঁচা ঘুম ভেঙে ছুট্ । এসে হতবাক; কোথাও কেউ নেই। বারান্দায় নেই, রুমে নেই, এমনকি ছাদেও নেই। এত অল্প সময়ে পালিয়ে যাওয়া; অসম্ভব!  বলতো - আমরা কোথায় ছিলাম?

- ঠিক বুঝতে পারছি না।

- টয়লেটে! এক টয়লেটে পাঁচজন। ভাবতে পার!

 রিনরিনে গলায় ঝংকার তুলে হেসে উঠত মেয়েটি। কি হাসিটাই না হাসত সে! সে হাসির স্রোত বয়ে যেত আকাশের শিরায় শিরায়। অদ্ভুত এক ভাললাগা! হাসি থামলে পরে আকাশ বলত,

- বৃষ্টি, তুমি মেঘ হবে?কেন!

দেখনা; বৃষ্টি সবসময় আকাশকে ছেড়ে চলে যেতে চায়। কি স্বার্থপর দেখেছ! আকাশের উষ্ণতায় তার জন্ম, আকাশের নির্ভরতায় তার বড় হওয়া; আর, যখন সে পরিপূর্ণ - না বৃষ্টি! আমি তোমাকে হারাতে চাই না। তুমি মেঘ হও। আকাশের বুকে ভেসে-ভেসে থাক । আকাশ সারাজীবন তোমার স্পর্শ নিয়ে বেঁচে থাকবে।

- আমার কিইবা করার আছে বল? আমি যে বৃষ্টি -

- না বৃষ্টি ! তুমি, প্লীজ - মেঘ হয়ে যাও।

ভয় নেই আকাশ; বৃষ্টিরা ফিরে ফিরে আসে। বৃষ্টিরা খুব দুঃখী; জান! আকাশে গেলে পৃথিবী টেনে নিয়ে আসে - প্রবলভাবে। তুমি ভাবতেও পারবে না কি ভয়ঙ্কর সে আকর্ষণ। বৃষ্টির কিছুই করার থাকে না আকাশ! নিরুপায় সে -। আর যখন সে পৃথিবীতে মিশে; অস্তিত্বহীন! তুমি কেন তাকে স্বার্থপর বল? যার নিজস্বতা বলে কিছুই নেই তার স্বার্থ কিসে!

বলতে বলতে গলাটা ধরে আসত ওর। সেই বিষণতা ছুঁয়ে যেত আকাশকে। কিছুক্ষণ নীরব সময় কাটিয়ে সে বৃষ্টিকে গান শোনাত 

”আকাশের সব তারা ঝরে যাবে তবু - তোমাকে দেখার সাধ মরবে না”

ততক্ষণে আকাশের সব তারা একে একে ঝরে গিয়ে পূর্বাকাশে আবীরের খেলা। আকাশের চোখে রাজ্যের ঘুম; হৃদয়-সাগরে থেমে আসা ঘূর্ণিঝড়।

চারমাস পর এক চাঁদনী রাতে সত্যি সত্যিই ঝড় উঠল। মাঝরাতে চাঁদের বর্ষণে ভিজতে ভিজতে বৃষ্টিকে হয়তো চাঁদের মোহ পেয়ে বসেছিল। অনেক কথার পর আবেগী গলায় সে বলল

- তোমাকে আমি খুব জ্বালাই; তাই না।

- তা ঠিক।

- আর কিছুদিন সহ্য করা যাবে?

- যদি বলি, না?

- আমি তাহলে কল করা বন্ধ করে দিই।

- সেটাই ভাল।

- তোমার কষ্ট লাগবে না?

- কেন!

- মজার কথা কি জান; একদিন তুমি ঘন্টার পর ঘন্টা এই নাম্বারে ট্রাই করে যাবে  - আমাকে আর পাবে না। সেদিন তোমার প্রচন্ড মন খারাপ হবে।

বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ে মেয়েটি।  ভয়ঙ্কর রকমের মন খারাপ করা কান্না। কাঁদতে কাঁদতে সে বলে, এই পূর্ণিমাই হয়তো ওর জীবনের শেষ পূর্ণিমা। ব্রেন ক্যান্সারের বন্দী সে।

No comments: