Wednesday, October 06, 2010

গন্ধপুরাণ (২)

চিৎকারটা একটু জোরেই হয়েছিল। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া দু-একটি উৎসুক মুখ গলা উঁচিয়ে দেখে। এত বড় বড় দুটো ছেলেমেয়ের বাচ্চাসুলভ আচরণে বেশ মজা পেয়েছে তারা। এতক্ষণে আমার বোনের টনক নড়ে। তড়িঘড়িতে গেইট বন্ধ করে সে- এ কাজে বেশ সিদ্ধহস্ত; দিনে কতবার যে কাজটি ওকে করতে হয়- কে জানে।
- মা কেমন আছে রে ? শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে প্রশ্ন করে সে।
- ভালোই। কাল-পরশুর দিকে আসতে পারে। আজকেই আসতে চেয়েছিল-
- নিয়ে আসলিনা কেন ?
- বাসায় গেলে তো-। অফিস থেকে সুপার মার্কেট; মোবাইল কিনে তোর এখানে।
- তোর না মোবাইল সেট আছে- বেশ দামী।
- আমি তো তোর জন্য কিনেছি।
- হঠাৎ এত সুবুদ্ধি।
- তোর মনে না থাকতে পাওে; আমার আছে। ইঞ্জিনিয়ারিং-এ চান্স পাওয়ার পর খুব খেপিয়েছিলি তুই - বেশি কিছু না; শুধু একটি মোবাইল সেট- ইঞ্জিনিয়ার সাহেব। মনে পড়ে ?

সে অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল একবার। সেখানে আশ্বিনের কালো মেঘ। তৎক্ষনাৎ মুখ ফিরিয়ে নিল- ‘ঘরে চল’।
কিছু একটা হয়েছে ওর। না জানি কোনো বিষণ্ণতা ওতে ভর করল! বিয়ের পর থেকে এমন হয়ে পড়েছে সে। অথচ আগে- 
কি উচ্ছল! সব সময় হাসত মেয়েটি; সব কিছুতেই অসাধারণ। দোষের মধ্যে একটাই- কাঁচা মাছের গন্ধ সহ্য হতো না ওর। মাছের বাজারের পাশ দিয়ে গেলেই গা গুলানো ভাব দেখাত সে। আমি ক্ষেপানোর রাজা- কথায় কথায় উস্কানি দিতাম
তোর বিয়ে হবে মাছ বিক্রেতার সাথে। ঘরভর্তি মাছ; তোর গা থেকেও মাছের গন্ধ বের হবে রে-
- ওয়াক্!
সে বমির ভাব করত। আমি মজা পেতাম। হাতাহাতিও মাঝেমধ্যে- বয়সে সে আমার এক বছরের বড়। আমার স্কুল মাস্টার বাবার সংসারে এ এক আর্শিবাদ। ঘরের সবকটি কাজই সে করত (মাছ কাটা ছাড়া)।
অংকে অসাধারণ মাথা ছিল ওর; পারতনা ইংরেজি। অবশ্য এত কাজের ফাঁকে পড়ার সময় হয়ে উঠত না ঠিকটি। আমি চির অলস- একগ্লাস পানিও ঢেলে নিয়ে খাইনি কখনো। স্বপ্নীল ছিল দিনগুলো- বোনটিকে দেখলে সেসব স্মৃতি বারবার মনের পর্দায় উঁকি দিয়ে উঠে। ভাবনার অবসরে সে প্রশ্ন তুলে
- মোবাইলটা কত দিয়ে কিনলি ?
- আরে, দাম দিয়ে কি হবে। দেখনা - এটা দিয়ে ছবি তোলা যায়, ভিড়িও করা যায়, নেট আছে-
সে তীব্রদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। ঐ দৃষ্টির সামনে নিতান্তই অসহায় আমি- বিড়ালের থাবায় বন্দী ইঁদুরছানা। কম্পিত গলা ভেদে বেরিয়ে আসে-
- ছাব্বিশ হাজার সাতশ টাকা।
সে তেমনভাবেই চেয়ে থাকে। ক্ষণপরে লম্বা এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পিছু ফেরে।
- মোবাইলটা দেখবি না!
- তুই বস। আমি চা বানিয়ে আনি।

No comments: