Friday, October 08, 2010

ধ্বংসের পাটাতনে (২)

ভাবনায় ছেদ পড়ে। একটা শোরগোল ধেয়ে আসে সেখানে- নারীকন্ঠের হাঁউমাউ, বুড়ো মানুষের খনখনে গলা, বাচ্চাকাচ্চার অসহ্য চেঁচামেচি; এর মধ্যে ভাঙা গলায় কি সব বলতে বলতে এগিয়ে আসে হরিপদ। কপালের কিনার বেয়ে রক্তের ধারা- কেউ মাথায় মেরেছে তার। -কে? রসুল ছুটে যায়। অমনি সবাই যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ে। সবাই বলে- বর্ণনার জট লেগে যায়। তার মধ্য থেকে যা বোঝা যায় তা হল; কিছুক্ষণ আগে বাধের উপরে গফুর মোল্লা হরিপদকে ডেকে বলে
-সবাইকে লিয়ে বিকোলের আগে বোরেয়ে যাবি। হামার জমিন হামাকে খালি কোরে দিবি।
-তুমার জমিন! আমরা যাচ্ছি নে কোথাও। যা খুশি কোরে লাও।
অমনি বলা নেই, কওয়া নেই- হাতের লাঠিটা সজোরে হরিপদের মাথায়
বসিয়ে দিল গফুর। বাধশুদ্ধ মানুষ চেয়ে চেয়ে দেখল; কেউ বললনা কিছুই। এ এলাকায় গফুরকে ভয় পায় সবাই; গোপনে অনেক কিছুই শোনা যায়- কি সব র্পাটি-র্ফাটি করে; কারো সাথে বনিবনা না হলে হাত-পাও এর রগ কেটে দেয়। এইতো গেল বছর বাধের উপর যে জোড়া-খুনটা হল- ভয়ে কেউ ঘাটায় না ওকে।

এই হট্টগোলে অতকিছু ভাবার ফুসরত নেই রসুলের। -মগের মুল্লুক পেয়েছে! ও বলল আর অমনি চোদ্দ ঘর মানুষ সবকিছু ছেড়ে-ছুড়ে গাঙে ভাসান! আর সহ্য করা যায় না- চল সবে! বেশিদূর যেতে হয় না গফুর সেদিকেই আসছিল
-কি রে রাছুল! তোরা নাকি ঘর ছাড়বিনে?
-ছাড়ব ক্যানে! উ কি তুমার জমিন?
-ছ্যেল না। তবে এখন হামার- সরকারি জমিন; হামি লিজ নিলেম।
-ঝুট্! উ তো নেরঞ্জনের জমিন- সবে জানে।
-তু কি পাগল হলি! পাগল-ছাগল লোক, বনে-বাদারে ঘুইরে মরে, বাপ-মা ছ্যেল কি ছ্যেল না- উর জমিন কিসের!
-অত বুঝিনে বাপু! আমরা যাচ্ছিনে কোথাও।
-ভাল হবি নে রাছুল। জানে বাঁচবিনে একটো।
গফুর রাগে অগ্নিগিরি। শার্দুলের মত হিংস্র চোখজোড়া দপদপিয়ে জ্বলে উঠে যেন- আগুন ওখানে। সে আগুনের সামনে বেশিক্ষণ টিকতে পারে না হিন্দুগুলো। তৎক্ষণাৎ হুড়োহুড়ি- বিছানা-পত্তর, বাসন-কোসন; হিন্দুগুলো ঘর ছাড়ে। -মালাউনের বাচ্চোরা! মুরগার কলজা লিয়ে হাঁটে! -রাগে-দুঃখে রসুলের চোখ বেয়ে পানি চলে আসে। অথচ এতদিন, কতভাবে তাকে উষ্কিয়েছে তারা
-বাপ-দাদার মাটি; এমনি ছেইড়ে দিবো!
-তু মোগো ছেইলে; তু বল- এমনি এমনি ওই বিটা সব লিয়ে লিবে! আমরো চায়ি চায়ি দিখব!
-বল তো বাপ; হেন্দু বলি মোগে পেটে সবাই লাত্থি মারে ক্যান।
-তু মোগো লাগি কিছু করবিনে রাছুল?

ওই করতে গিয়েছিল সে। কি লাভ ছিল তার! অবশ্য লাভ যে একেবারেই ছিল না তা নয়। পাড়াটাতে সর্বসাকুল্যে পাঁচঘর হিন্দু আর নয়ঘর মুসলিম পরিবার- অনেকদিন ধরে একসাথে আছে ওরা; ঝগড়া-ঝাঁটি প্রায়শই- বৃহৎ স্বার্থে সবাই এক। উপায় নেই এ ছাড়া- জায়গাটা কারো পৈত্রিক সম্পত্তি না; বাঁধের পাড়ের একফালি জমি- বার বছর ধরে বাস ওদের- ওরা জানে এটা নিরঞ্জন পাগলার। ওকে নিয়ে ভয় ছিল না। ভয় ছিল অন্যখানে- ও বংশের অন্য কেউ যদি খোঁজ নিতে আসে; আসেনি কখনো। বিপদ এল এমন জায়গা থেকে; ধারণাই ছিল না ওদের।

No comments: